Breaking News

করাচিতে রচিত হলো বাবর-নামার সেরা অধ্যায়!

বাবর—শব্দটির বাংলা মানে বাঘ। কিন্তু করাচি টেস্টে বাবর আজমের তিনটি ছবির কোলাজ যদি করা হয়, কী পাবেন সেখানে? প্রথম ছবিটা গতকালের, পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে বাবর আজম যখন ব্যাট করতে উইকেটে আসেন—শুকনো মুখ তাঁর। দ্বিতীয় ছবিটি আজ শেষ বিকেলের, ১৯৬ রানে তিনি যখন আউট হয়ে ফেরেন। অসাধারণ এক ইনিংস খেলার জন্য তাঁকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর মুখটা শুকনো। যেন যুদ্ধের শেষ খণ্ডে এসে পরাজিত এক সৈনিক মুখ লুকিয়ে ফিরছে শিবিরে।

তৃতীয় ছবিটাও প্রায় একই রকম। আউট হয়ে তিনি যখন সাজঘরে ফিরলেন, সতীর্থেরা তাঁকে পিঠ চাপড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, কিন্তু বাবর ভাবলেশহীন, তীরে এসে তরি ডোবায় হতাশ এক নাবিক যেন। বাবর নামের যা অর্থ, এর সঙ্গে এমন চেহারা একটু বেমানানই।

এবার আরও কিছু ছবির কোলাজ যদি করা হয়, সেখানে কী দেখা যাবে? সেই ছবিগুলো করাচির টেস্টে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাটিংয়ের। ধীরস্থির আর কী শান্ত স্বভাবের ব্যাটিং। যেন এক যোগী আসন পেতে ধ্যানে বসেছেন কোনো পাহাড়ের পাদদেশে। পৃথিবীর কোনো মোহই তাঁর ধ্যান ভাঙতে পারবে না।

করাচির উইকেটে ঠিক এভাবেই গেঁড়ে বসেছিলেন বাবর। এটাও তো তাঁর নামের অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়! বাঘ মানেই তো হুংকার ছাড়বে, শিকার ধরতে করবে তীব্র আক্রমণ, থাবা বসাবে শিকারের ঘাড়ে।

তবে বাবর দুদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে শান্ত ও ধীরস্থির ব্যাটিং করলেন, তা দলের প্রয়োজনেই। পাকিস্তানের সামনে জয়ের জন্য ৫০৬ রানের লক্ষ্য দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট ক্রিকেটে ৪১৮ রানের বেশি তাড়া করে জেতেনি কোনো দল।

৫০৬ রানের মতো ‘অলঙ্ঘনীয়’ পাহাড় পাকিস্তান পেরোতে পারবে কি না—করাচি টেস্ট নিয়ে এমন প্রশ্ন তাই খুব বেশি মানুষ করেনি। এর চেয়ে বরং বেশি প্রশ্ন ছিল, পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসের জন্য যে সময় রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া, সেটা নিয়ে। টেস্ট বাঁচাতে পাকিস্তানের জন্য ১৭২ ওভার খেলার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল অতিথি দল।

পাকিস্তান যে এত বড় চ্যালেঞ্জ পেরোতে পেরেছে, তা মূলত ‘যোগী’ বাবরের কারণে। গতকাল বাবর যখন উইকেটে আসেন, ২১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে পাকিস্তান। ১৭২ ওভারের মাত্র ২২.২ ওভারই শেষ হয়েছে তখন। বাবরের মুখ তো শুকনো থাকবেই!

কিন্তু শুকনো মুখের ভেতরে ছিল শক্ত চোয়াল। শুরুটাই যেন করেছিলেন ম্যাচ বাঁচানোর চোয়ালবদ্ধ পণ করে। বাবরকে ক্যামেরন গ্রিন উইকেটে স্বাগতই জানান ভালো একটি বাউন্সারে। কিন্তু বাঘের মতো লাফিয়ে শিকার করতে না উঠে বাবর তাঁর লড়াই জয়ের সংকল্পের ঘোষণা দেন সেটিতে ডাক করে।

এরপর বাবর খেলেছেন আরও ৪২৪ বল, উইকেটে ছিলেন ৬০৩ মিনিট। বাবরের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে গ্রিনের আরও অনেক বাউন্সার, প্যাট কামিন্সের সুইং ও গতি, মিচেল স্টার্কের রিভার্স সুইং। মিচেল সোয়েপসন ও নাথান লায়ন তাঁকে জড়াতে চেয়েছেন ঘূর্ণির মায়াজালে, ফেলতে চেয়েছেন ভাসিয়ে দেওয়া বলের মোহে! কিন্তু কোনো কিছুই বাবরের ধৈর্যে চ্যুতি ঘটাতে পারেনি।

শম্বুকগতিতে এগিয়ে চলতে চলতে তিনি কখনো কোনো বোলারের ওপরই সেভাবে চড়াও হননি। তবে কখনো মায়াবী কাভার ড্রাইভ, কখনো আবার চোখজুড়ানো স্ট্রেট ড্রাইভ অথবা রেশমি পুশে চোখ জুড়িয়েছেন বিশ্বজোড়া ক্রিকেটপ্রেমীদের।

৪২৫ বলে ৪৬.১১ স্ট্রাইক রেটের ইনিংসটিতে ২১টি চার মেরেছেন বাবর, মেরেছেন একটি ছয়ও। তাঁর এই বাউন্ডারি আর ওভার বাউন্ডারিতে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া। হ্যাঁ, লম্বা এই ইনিংসে তিনটি সুযোগই তিনি দিয়েছেন, যার একটিতে ফিরেছেন শর্ট ফরোয়ার্ড লেগে ক্যাচ হয়ে। লায়নের বলটি সামনে এগিয়ে গিয়ে রক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বল ব্যাটের পর প্যাডে লেগে জমা পড়ে মারনাস লাবুশেনের হাতে।

এ ক্যাচটি দেওয়ার আগে তিনি যখন ১৫৭ রানে, এই লায়নের বলে তাঁর বিরুদ্ধে এলবিডব্লুর আবেদন করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা। আম্পায়ার আলিম দার আঙুল তোলেনি। অস্ট্রেলিয়া রিভিউ নেয়, কিন্তু একটুর জন্য বেঁচে যান তিনি। এরপর সোয়েপসনের টানা দুই বলে শর্টে তাঁর ক্যাচ ছাড়েন ট্রাভিস হেড ও লাবুশেন।

এত লম্বা একটা ইনিংস, দু-একবার তো এমন হতেই পারে, ভাগ্যের একটু ছোঁয়া তো তিনি পেতেই পারেন। ভাগ্য তো বীরদেরই সহায়তা করে! তা যাহোক, এই ইনিংসে তিনি ত্রিফলা রেকর্ডের মালিক হয়েছেন –

* চতুর্থ ইনিংসে তাঁর ১৯৬ রানের চেয়ে বেশি করতে পারেননি পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যান।

* চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বল খেলা ব্যাটসম্যান এখন তিনিই।

* এর চেয়ে বড় রেকর্ডটি হলো, অধিনায়ক হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রান করা ব্যাটসম্যানও বাবর। এ রেকর্ডটি এত দিন ছিল ইংল্যান্ডের মাইক আথারটনের, ১৯৯৫ সালে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনি চতুর্থ ইনিংসে খেলেছিলেন ১৮৫ রানের ইনিংস।

এত কিছুর পরও একটা আক্ষেপ হয়তো বাবরের থেকেই যাবে—৪ রানের জন্য যে পাওয়া হলো না ক্যারিয়ারের প্রথম দ্বিশতক। কিন্তু ম্যাচ শেষে তেমন কোনো আক্ষেপের কথা বলেনইনি বাবর। তিনি বরং টেস্ট ড্র করতে পারার আনন্দে উচ্ছ্বসিত। ম্যাচ শেষে বাবরকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সাবেক ক্রিকেটাররা।

পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান রশিদ লতিফ তাঁর টুইটে করলেন বাবরের ইনিংসটা বিশ্লেষণ, ‘পাকিস্তানি ব্র্যাডম্যান—মনোসংযোগ, টেকনিক, স্কিল, ধৈর্য। রাজা।’ ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন তো তাঁকে সময়ের সেরা বলেই আখ্যা দিয়ে দিলেন, ‘আমার কাছে প্রশ্নাতীতভাবে বাবর এই সময়ের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ব্যাটসম্যান।’

এবার বাবর আজমের নামটা বুঝি সার্থক হলো! ভনের প্রশংসার সঙ্গে মিলে যায় বাবরের নামের অর্থ। বাবর মানে বাঘ, আজম মানে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাহলে বাবর আজমের অর্থ দাঁড়ায় সর্বশ্রেষ্ঠ বাঘ! আর বাঘের মূল লক্ষ্যই তো থাকে লড়াই জেতা। ছল, বল বা কৌশল—যেকোনোটি দিয়ে সে লড়াই করে জিততে চায় শিকার ধরার লড়াই। বাবরও কৌশল, দক্ষতা আর ধৈর্য দিয়ে জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট বাঁচানোর কঠিন লড়াই।

কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত প্রদান করুন।

About Cricvive Desk

Cricvive is a sports media company that produces original video, audio, and written content for cricvive.com and other media partners, as well as the general public and news organizations.

Check Also

শাস্তি পেলো ভারত, লাভ হলো পাকিস্তানের

ভারত দলের ব্যাটিং লাইনআপকে বলা হয় বিশ্বসেরা। আর বিশ্বসেরারদের সামনে জো রুট ও জনি বেয়ারস্টোর …

Leave a Reply

Your email address will not be published.