Breaking News

সাকিব আল হাসান কি বাংলাদেশের ক্রিকেটের চেয়েও বড়?

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, মানে বিসিবি কী চাইল না চাইল, তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চাওয়া না–চাওয়াতেও না। সাকিব আল হাসান কী চাইছেন, সেটাই শেষ কথা। সাকিব আল হাসান শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ই নন, তিনি ক্রিকেটের চেয়েও বড়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের চেয়ে তো বটেই।

পড়তে পড়তে আপনার কুঁচকে যাওয়া ভুরু মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি। কোনো ক্রিকেটার, তা তিনি যত বড়ই হোন না কেন, খেলাটার চেয়ে বড় হতে পারেন নাকি! ব্র্যাডম্যান–সোবার্স–টেন্ডুলকাররাও তো কখনো এমন দাবি করার সাহস পাননি। সাকিব নিজেও অবশ্য তা দাবি করেননি। তারপরও এমন মনে হওয়ার কারণটা আপনার অনুমান করে ফেলার কথা।

প্রায় প্রতিটি ট্যুরের আগেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিয়মিত হয়ে যাওয়া নাটকের সর্বশেষ পর্বটা মঞ্চস্থ হয়েছে তো খুব বেশিক্ষণ হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যেতে অনিচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন সাকিব। কোন সিরিজ খেলবেন, কোনটি খেলবেন না—এ ব্যাপারে সাকিবের ইচ্ছাই যে চূড়ান্ত, আবারও এটিকে সত্যি প্রমাণ করে বিসিবি তাঁকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ‘বিশ্রাম’ দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ ১৮ মার্চ শুরু হয়ে ১২ এপ্রিল শেষ—এটা জানা থাকলে সাকিব যে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাচ্ছেন না, তা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ছে না।

বলতে পারেন, সাকিবের চাওয়া মেনে নেওয়া ছাড়া বিসিবির আর কি উপায় ছিল! কোনো ক্রিকেটার শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কথা বলে খেলতে না চাইলে তাঁকে কি জোর করে খেলানো যায় নাকি?

আসলেই যায় না। কিন্তু সাকিবের অতীত ইতিহাস এবং ওই শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কথা জানানোর ধরন বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দিতে বাধ্য। যার মধ্যে আছে এই প্রশ্নটাও—সাকিব কি নিজেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চেয়েও বড় ভাবতে শুরু করেছেন? ধরেই নিয়েছেন, তিনি যা চাইবেন, শেষ পর্যন্ত তা–ই হবে?

সাকিবের আর কী দোষ, এমনই তো হয়ে আসছে। আবারও যেমন হলো। সাকিবের ‘সম্মতি’ নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দল ঘোষণা করা হয়েছিল। অথচ তিন দিন আগে এক মুঠোফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনী কাজে দুবাই যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের হঠাৎই বলে দিলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি এতই ক্লান্ত যে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে গেলে নিজের সেরাটা দিতে পারবেন না। এরপরও খেললে তা সতীর্থ ও দলের প্রতি প্রতারণার শামিল হবে।

বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে হাওয়ায় যা ভাসিয়ে দিলেন, তাতে অবশ্য একটু নতুনত্বের ছোঁয়া ছিল। গত চার-পাঁচ বছর ওয়ানডেতে মোটামুটি নিয়মিতই ছিলেন, বাদ দিয়েছেন মূলত টেস্ট ম্যাচই। এবার সাকিব বললেন, সফরের শুরুতে ওয়ানডে সিরিজটাতে যদি ছুটি পান, তাহলে টেস্ট সিরিজে তরতাজা হয়ে খেলতে পারবেন। তার মানে সাকিব তো শুধু ওয়ানডে সিরিজে ছুটি চেয়েছিলেন, তাহলে বিসিবি কেন তাঁকে টেস্ট সিরিজ থেকেও ছুটি দিয়ে দিল? হ্যাঁ ভাই, এই সিদ্ধান্তও সাকিবই নিয়েছেন।

দুবাই থেকে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানকে ফোনে জানিয়েছিলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাতে দেশে ফিরে তিনি সামনাসামনি বসে কথা বলতে চান। পরের দিন, অর্থাৎ শুক্রবারই বাংলাদেশ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা রওনা হয়ে যাওয়ার কথা, আগের রাতে সভায় বসে কী হবে? বোর্ড সভাপতির যৌক্তিক এই প্রশ্নের পর ক্রিকেট অপারেশনস্ কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুসের সঙ্গে সাকিবের কথা হয়। সাকিব তাঁকে জানিয়ে দেন, শুধু ওয়ানডে সিরিজ নয়, টেস্ট সিরিজেও তিনি খেলতে চান না। লিখিতভাবে তা জানানোর কথা বলায় সাকিব মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে দেন। এরপর বিসিবির ঘোষণাটা হয়ে যায় নিছকই আনুষ্ঠানিকতা।

এ নিয়ে বাংলাদেশের টানা দ্বিতীয় সফরে দল ঘোষণা করে দেওয়ার পর সাকিব সরিয়ে নিলেন নিজেকে। গত ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফর থেকে ছুটি চেয়ে যখন বিসিবিকে চিঠি দেন, তার আগেই দুই টেস্টের সিরিজের জন্য দল ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল। ইনজুরি বা অন্য কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া দল ঘোষণা করে ফেলার পর কোনো ক্রিকেটারের এমন সরে দাঁড়ানোর ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসেই আর আছে বলে মনে করতে পারছি না। পরপর দুটি সফরে তো অবশ্যই না।

আধুনিক ক্রিকেটের এমনই রুদ্ধশ্বাস সূচি যে, ক্রিকেটারদের ক্লান্তি আসতে বাধ্য। বিশেষ করে যারা তিন ফরম্যাটেই খেলেন। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে কোভিডের কারণে বায়োবাবলের যন্ত্রণা। সাকিবের সমস্যা আরও বড়। তাঁর পরিবার থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দুই সিরিজের মাঝখানে ছুটি পেলেও আকাশেই কেটে যায় অনেকটা সময়, জেট–ল্যাগ কাটাতে আরও কিছুদিন।

মাস তিনেক আগে এক সাক্ষাৎকারে এই কষ্টের কথা আমাকে সবিস্তারে বলেও ছিলেন সাকিব। যা শুনে তাঁর প্রতি যে কারও সহানুভূতি জাগতে বাধ্য। কিন্তু সঙ্গে এই প্রশ্নটাও—সাকিবকে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে কখনো ছুটি নিতে দেখা যায়নি কেন? দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময়ই যে আইপিএল, তাতে দল পেলে কি তিনি খেলতেন না? বিজ্ঞাপনের শ্যুটিংয়েও তাঁর অবিশ্বাস্য ব্যস্ততা। সবকিছু দেখে যদি কারও মনে হয়, বাংলাদেশের পক্ষে খেলাটা সাকিবের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে তো নেই–ই, বরং তা অনেক নিচের দিকে, তা কি ভুল হবে?

প্রতিটি সফরের আগেই সাকিবকে নিয়ে যে অনিশ্চয়তা, এর কোনো তুলনাও তো বিশ্ব ক্রিকেটে নেই। অথচ তিনি ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। যে চুক্তির উদ্দেশ্যই ক্রিকেটারদের সব সিরিজে পাওয়া নিশ্চিত করা। জরুরি প্রয়োজনে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ও কোনো সিরিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতেই পারেন। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস তো মানসিক অবসাদের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে।

কিন্তু এসব ব্যতিক্রমী ঘটনাই সাকিবের ক্ষেত্রে একরকম নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং প্রতিবারই একই ঘটনাক্রম—নানা বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত সাকিবেরই জয়। তিনি যা চান, তা–ই হয়। সাকিবও তা জানেন। জানেন বলেই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাওয়া না–যাওয়ার ব্যাপারে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করার চেয়ে দুবাই যাওয়াটাই তাঁর কাছে বেশি জরুরি বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সাকিব অনেক কিছু দিয়েছেন। বিনিময়ে বাংলাদেশও কিন্তু সাকিবকে কম দেয়নি। সাকিবও নিশ্চয়ই তা জানেন। তারপরও বিসিবির অনেক আগেই এটা তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, সাকিবকে পেলে বাংলাদেশ দলের শক্তি এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়। তাঁর খেলা না–খেলাটা এত বড় হয়ে ওঠে এ কারণেই। কিন্তু তাঁর এই ’পিক অ্যান্ড চুজ’ করে খেলাটা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হচ্ছে। অধিনায়কদের পরিকল্পনা করতে সমস্যা হচ্ছে। সাকিব এক সিরিজে আছেন, আরেক সিরিজে নেই—বাংলাদেশের দল হিসেবে গড়ে ওঠার পথেও এটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তরুণ খেলোয়াড়েরাও পাচ্ছেন ভুল বার্তা।

এবার মনে হয় বিসিবিরও একটা শক্ত বার্তা দেওয়ার সময় এসেছে। কোনো ক্রিকেটারই বাংলাদেশের ক্রিকেটের চেয়ে বড় নয়, এমনকি সেই ক্রিকেটারের নাম সাকিব আল হাসান হলেও!

কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত প্রদান করুন।

About Cricvive Desk

Cricvive is a sports media company that produces original video, audio, and written content for cricvive.com and other media partners, as well as the general public and news organizations.

Check Also

শাস্তি পেলো ভারত, লাভ হলো পাকিস্তানের

ভারত দলের ব্যাটিং লাইনআপকে বলা হয় বিশ্বসেরা। আর বিশ্বসেরারদের সামনে জো রুট ও জনি বেয়ারস্টোর …

Leave a Reply

Your email address will not be published.